দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্র হরিলুট করছে ম্যানেজার দিপঙ্কর!

Sharing is caring!

স্টাফ রিপোর্টার: ইছামতি নদীর কোল ঘেষে সুন্দরবনের আদলে নির্মিত দেবহাটার রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রটি হরিলুট করে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন দায়িত্বরত ম্যানেজার দিপঙ্কর ঘোষ। পর্যটন কেন্দ্রটি বর্তমানে দেবহাটা উপজেলা ও সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসনের যৌথ তত্বাবধানে পরিচালিত হলেও দীর্ঘ কয়েক বছর যাবৎ পর্যটন কেন্দ্র সম্পর্কিত কমিটির সুনির্দিষ্ট কোন কার্যক্রম, নজরদারি ও তদারকি না থাকার সুযোগে ম্যানেজার দিপঙ্করের দুর্নীতি ও অনিয়ম ক্রমশ ব্যাপক আকার ধারন করেছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের দর্শনীয় পর্যটন কেন্দ্রটি গত বছর জণপ্রশাসন পদকে ভুষিত হওয়ার পর ইতোমধ্যেই সেখানকার উন্নয়নে ডজনখানেক মেগা প্রকল্পের জন্য বিশ কোটি টাকা বরাদ্দও করেছে বর্তমান সরকার।
তবে সরকারের এসকল উন্নয়ন কর্মকান্ড সমুহ ব্যহত করতে সীমাহীন দূর্নীতি, অনিয়ম, স্বেচ্ছাচারিতা, হরিলুট ও অর্থলোপাটের মাধ্যমে ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রটিকে ক্রমশ ধ্বংসের পথে নিয়ে যাচ্ছেন দায়িত্বরত ম্যানেজার দিপঙ্কর ঘোষ। তাই পর্যটন কেন্দ্রটি রক্ষায় সংশ্লিষ্ট কমিটির কার্যক্রম সচল, ইজারা, টিকিট বিক্রি থেকে শুরু করে সকল খাতের আয় ব্যায়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা এবং নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি ও সুষ্ঠ তদারকি অতি জরুরী হয়ে উঠেছে।
তথ্যানুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০১০-১১ সালে বহু প্রতিকুলতা উপেক্ষা করে দেবহাটার শিবনগরে ইছামতি নদীর ভাঙন কবলিত নোম্যান্স ল্যান্ড রক্ষা, জীববৈচিত্রের অভায়ারন্য ও বিনোদন কেন্দ্র সৃষ্টির লক্ষ্যে সরকারী চরভরাটি কয়েকশ বিঘা সম্পত্তিতে দখলদারদের উচ্ছেদ পরবর্তী পর্যটন কেন্দ্রটি স্থাপন শুরু করা হয়। সেসময়ে সেখানে সরকারী জমির পরিমান ছিলো ১০ হেক্টর। যারমধ্যে বনাঞ্চল ছাড়াও রয়েছে প্রায় একুশ বিঘা জমির একটি লেক ও আশপাশে রয়েছে আরো কয়েকটি মৎস্য চাষ যোগ্য মাঝারি ও বড় আকারের বিস্তৃর্ন ঘের। বনাঞ্চল সৃষ্টির পর থেকে বিভিন্ন সময়ে লেকসহ মৎস্য ঘেরগুলি উন্মুক্ত অবস্থায় রাখা হয়েছিলো। তখন সেখানকার মাছ চাষের যাবতীয় টাকা পর্যটন কেন্দ্রটির আয় হিসেবে ধরা হতো। ২০১৭-১৮ সালে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসার হাফিজ-আল-আসাদ থাকাকালীন ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রের দেখাশুনার জন্য দায়িত্ব দেয়া হয় দেবহাটা কলেজ সংলঘ্ন মৃত তারাদাশ ঘোষের ছেলে দিপঙ্কর ঘোষকে। এরপর থেকে পর্যটন কেন্দ্র ঘিরে শুরু হয় নানামুখী দূর্নীতি ও অনিয়ম। ২০১৮-১৯ সালে উন্মুক্ত থাকা স্বত্ত্বেও পর্যটন কেন্দ্রের ২১ বিঘা বিস্তৃত অনামিনা লেকটি ইজারা ছাড়াই মৎস্য ঘের হিসেবে মাছ চাষ করেন দিপঙ্কর। বছর জুড়ে বাগদা ও গলদা চিংড়ি সহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ চাষ ও বিক্রির লক্ষ লক্ষ টাকার কানাকড়িও তিনি জমা দেননি পর্যটন কেন্দ্রের আয়ের খাতায়। এছাড়া গত বছর ম্যানগ্রোভের ভিতরে থাকা অন্যান্য বড় ও মাঝারি ঘেরগুলো উপজেলা প্রশাসনের নজর এড়িয়ে ব্যাক্তি সম্পত্তির মতো স্থানীয় ওহাব আলী, রেজাউল ইসলাম, হবিবর, মনি, উত্তম সহ আরো অনেকের কাছে ইজারা দিয়েও তিনি হাতিয়ে নিয়েছেন কয়েক লক্ষ টাকা। উন্মুক্ত থাকাবস্থায় ভেটকি ও চিংড়ি মাছের রেনুপোনা থেকে শুরু করে চাষকৃত বাগদা, গলদা চিংড়ী মাছ ও কাঁকড়া সব কিছুই খেয়াল খুশি মতো বিক্রি করেছেন ম্যানেজার দিপঙ্কর। মুলত বাগদা ও গলদা চিংড়ি মাছ পর্যটন কেন্দ্র সংলঘ্ন সজল নামের এক ব্যবসায়ী এবং ভেটকি সহ অন্যান্য প্রজাতির মাছ এবং কাঁকড়া পারুলিয়া মৎস্য সেড এবং আশপাশের কাঁকড়ার ঘরে বিক্রি করতেন দিপঙ্কর। যেসব অর্থের সুনিদ্দিষ্ট কোন হিসাব নেই উপজেলা প্রশাসনে থাকা পর্যটন কেন্দ্রটির আয় ব্যায়ের খাতায়। এমনকি পর্যটন কেন্দ্র থেকে আয়ের বিপরীতে ব্যায়ের অংশে আপ্যায়ন থেকে শুরু করে নানা খাতে মোটা টাকা ব্যায় দেখিয়ে প্রতিনিয়ত কারসাজির অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তাছাড়া প্রতিদিনের দর্শনার্থীদের প্রবেশের টিকিট বিক্রি ও বিক্রির টাকার হিসাব নিকাশেও দিপঙ্করের ছলতাচুরির অভিযোগের কমতি নেই। দর্শনার্থীদের কাছে বিক্রিত প্রতিদিনের টিকিটে তারিখ সহ সীল দেয়ার নিয়ম থাকলেও, তারিখ দেয়া হয়না কোন টিকিটেই। পাশাপাশি টিকিট বিক্রির দুটি কাউন্টারে আলাদা আলাদা বা ততোধিক সিরিয়ালের মুড়ি থেকে টিকিট বিক্রি করা হয়। যারমধ্যে একটি সিরিয়ালের টিকিটের টাকার হিসাব উপজেলার খাতায় তোলা হলেও, অপর সিরিয়ালের সমুদয় টিকিটের টাকা ম্যানেজার দিপঙ্করের পকেটস্থ হওয়ার তথ্যও মিলেছে স্থানীয়দের থেকে। আবার ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল পুরোপুরিভাবে নদীর লোনা পানির জোয়ার ভাটা ওঠা-নামার ওপর নির্ভরশীল হলেও, বনাঞ্চলটির ঠিক আগমুহুর্তে ইছামতি নদীর কোল ঘেষে রীতিমতো বাঁধ দিয়ে ছোট ও মাঝারি খন্ডাকারের পুকুর তৈরীসহ সেগুলোও প্রশাসনের নজর এড়িয়ে ইজারা দিয়ে ইজারার টাকা পকেটস্থ করছেন ম্যানেজার দিপঙ্কর। যেসকল টাকার কোন হিসাব নেই দেবহাটা উপজেলা প্রশাসনের খাতায়। কেবলমাত্র বনাঞ্চলের মুখে বাঁধ দেয়া ছোট ও মাঝারি খন্ডাকারের পুকুর গুলো ইজারা দিয়ে দিপঙ্কর হাতিয়ে নেয় অতিরিক্ত ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। আর সব খাত মিলিয়ে প্রতি বছর দিপঙ্করের হাতিয়ে নেয়া অর্থের পরিমান দাড়াচ্ছে কয়েক লক্ষ টাকায়। এতে করে প্রকৃতিগতভাবে ম্যনগ্রোভ বনাঞ্চলটিতে নদীর পানির স্বভাবিক জোয়ার ভাটা ওঠা-নামা ব্যাহত হওয়ায় পর্যটন কেন্দ্রটি যেমন ক্রমশ ধ্বংস হচ্ছে, তেমনি অপরদিকে প্রত্যক্ষ পরোক্ষ ইজারাসহ বিভিন্ন খাতের টাকা ম্যানেজার দিপঙ্করের পকেটস্থ হওয়ায় বিপুল অর্থ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সরকার।
শুধুমাত্র লেক, ঘের কিংবা পুকুর গুলো নয়, বনাঞ্চলের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া ড্রেন কিংবা ছোট খাটো ডোবা গুলোও কাঁকড়া ও রেনু পোনা আহরণের জন্য শিবনগর গ্রামের আমির হোসেন, ওহাব আলী সহ বিভিন্ন মানুষের কাছে মৌখিক চুক্তি ভিত্তিতে অহরহ ইজারাও দিচ্ছেন দিপঙ্কর।
আর এসব অপকর্ম ও অর্থ লোপাটের ঘটনা আড়াল করতে উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিসের আয় ব্যায়ের হিসাব রাখার দায়িত্বে থাকা দুই অফিস সহকারী সহ স্থানীয় প্রভাবশালীদের নিয়মিত ম্যানেজ করেন দিপঙ্কর। যারই অংশ হিসেবে এবছর ম্যানেজার দিপঙ্করের সাথে চুক্তিতে পর্যটন কেন্দ্রের সরকারি জমি ইজারা ছাড়াই দখল করে মৎস্য ঘের তৈরী করছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ও ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আবুল কাশেম। তার দাবী তিনি কেবলমাত্র ম্যানেজার দিপঙ্করের সাথে আলোচনা করে ইজারা ছাড়াই তৈরী করছেন মৎস্য ঘের। আর বিগত কিংবা চলতি বছরে অন্যান্য যাদের কাছে জমি ইজারা দেয়া হয়েছে তাদের কথায়ও রয়েছে ইজারার প্রতি বছরের টাকার অংক নিয়ে বেশ বড়সড় হেরফের। এক কথায় পর্যটন কেন্দ্রের লেক কিংবা মৎস্য ঘের সমুহ ইজারা নিয়ে উপজেলা বা জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেই কোন স্বচ্ছ প্রক্রিয়া। কেউ বলছেন বিনামুল্যে ঘের করছেন, কেউ বলছেন এখনো কোন চুক্তি হয়নি আবার কারো দাবী ১২ হাজার টাকা বিঘাপ্রতি ইজারা নিয়ে ঘের করছেন পর্যটন কেন্দ্রে।
মুলত বর্তমানে ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রের যাবতীয় কলকাটিই ম্যানেজার দিপঙ্করের মুঠোবন্দি। ফলে আয় ব্যায় থেকে সবকিছুই তিনি নিজের ইচ্ছেমতো সাজিয়ে পর্যটন কেন্দ্রের নানা খাতের টাকা খেয়াল খুশি মতো সহজেই পকেটস্থ করছেন তিনি। দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে সাজিয়া আফরীন যোগদানের পর এবছর কেবলমাত্র লেকসহ বেশ কয়েকটি মৎস্য ঘের ৫ লক্ষাধিক টাকায় ইজারা দেয়া হয়েছে। কিন্তু বিগত বছরে লেকটিতে মৎস্য চাষ ও এসকল ঘেরগুলো গোপনে ইজারা দিয়ে ও মাছ চাষ করে সমুদয় টাকা পকেটস্থ করেছেন ম্যানেজার দিপঙ্কর।
পর্যটন কেন্দ্রটি ক্রমশ ধ্বংসের দিকে ধাবিত হওয়া এবং সেখানে চলমান দুর্নীতি-অনিয়ম সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কমিটির সদস্য ও সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু বকর গাজী বলেন, পর্যটন কেন্দ্রটি শুধুমাত্র সদর ইউনিয়ন বা দেবহাটা উপজেলা নয় বর্তমানে সাতক্ষীরা জেলার একটি সম্পদ। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো দেবহাটাবাসীর যে আশা ও স্বপ্ন নিয়ে পর্যটন কেন্দ্রটি গড়ে তোলা হয়েছিলো সেটি আদৌ বাস্তবায়ন তো হয়নি, পাশাপাশি একক আধিপত্যের কারনে ক্রমশ পর্যটন কেন্দ্রটি ধ্বংসের দিকে এগিয়ে চলেছে। তাছাড়া সাতক্ষীরা জেলা প্রশাসক মহাদয়কে প্রধান করে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও আমি সহ কয়েকজনকে সদস্য করে একটি কমিটি গঠন করা হলেও বিগত ৫-৬ বছরের মধ্যে সেই কমিটির কোন কার্যক্রম নজরে আসেনি। কোন মিটিং হয়নি, আয়-ব্যায়ের কোন হিসাব বা তদরকি সম্পর্কে আমাদের অবহিত এমনকি উপজেলার কোন উন্নয়ন সমন্বয় সভাতেও ম্যানগ্রোভের তত্বাবধানের বিষয় নিয়ে আদৌ আলোচনা করা হয়নি। সেখানকার ইজারা বা আয় ব্যায় সব কিছুই থেকে গেছে আমাদের আড়ালে। যে কারনেই মুলত সেখানে ক্রমশ দুর্নীতি অনিয়ম তীব্র আকার ধারন করেছে। পর্যটন কেন্দ্রটি রক্ষায় গোপন ইজারা পদ্ধতি বাতিল সহ আয় ব্যায় ও অন্যান্য খাতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সুষ্ঠ তদারকি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া বিগত কিংবা বর্তমানে যেভাবে কার্যক্রম চলছে, সেভাবে চলতে থাকলে আগামী দশ বছরে ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে কোন অস্তিত্বই থাকবে না।
দেবহাটা উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব আব্দুল গনি বলেন, ইতোপুর্বেও বহুবার রূপসী ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রের দায়িত্বরত ম্যানেজার দিপঙ্করের বিরুদ্ধে দুর্নীতি-অনিয়ম ও অর্থলোপাটের অভিযোগ পেয়েছি। শীঘ্রই উপজেলা ও জেলা প্রশাসনের সাথে আলোচনা সাপেক্ষে অভিযোগ সমুহ তদন্ত করে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহনের পাশাপাশি পর্যটন কেন্দ্রটি রক্ষায় নিয়মিত প্রশাসনিক নজরদারি ও তদারকির উদ্যোগ নেয়া হবে।
এব্যপারে বর্তমান দেবহাটা উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাজিয়া আফরীন বলেন, ইতোপুর্বে ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে এধরনের দুর্নীতি-অনিয়মের ঘটনা কিভাবে ঘটেছে সেটি আমার জানা নেই। এগুলো তৎকালীন কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন। তবে অভিযোগ গুলো তদন্ত পরবর্তী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন সহ আগামীতে যাতে এধরনের ঘটনা না ঘটে সেজন্য পদক্ষেপ নেয়া হবে।
তবে যাবতীয় দুর্নীতি-অনিয়ম ও অর্থলোপাটের বিষয়ে জানতে চাইলে রীতিমতো সবকিছুই অস্বীকার করেছেন ম্যানেজার দিপঙ্কর। এমনকি ক্যামেরার সামনে কথা বলতেও রাজি হননি তিনি। তার দাবী, রূপসী দেবহাটা ম্যানগ্রোভ পর্যটন কেন্দ্রে যা কিছুই হচ্ছে তা সবই জানেন উপজেলা প্রশাসন।

newsadmin

সাতক্ষীরার গণমানুষের পত্রিকা--

shares